-->

কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী মনিদিপাদি পাশের বাড়ির দিদিকে চোদা ৪

দিন যায়, খেলার নিবিরতা আরও বেড়ে চলে, সময়ের বাঁধন ছাড়িয়ে ছাপিয়ে কোনদিন না ঘুমিয়ে সকাল পর্যন্ত খেলা চলে ওদের দুজনার। সারাদিন কলেজে দেবেশের মাথায় থাকে শুধু মনিদি আর মনিদি। আজকাল কলেজ থেকে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরে দেবেশ, সেটা দেখেও মায়ের মনে শান্তি। দেবেশের বাবা ভাবলেন যে ছেলের মতিগতি ফিরেছে, এদিকে ছেলের মতিগতি যে কোথায় গিয়ে ঠেকেছে তার ঠিকানা শুধু মাত্র মনিদিপার কাছে।

প্রায় দিন বিকেলে মনিদিপা চলে আসে ওদের বাড়িতে। নিচে কাকিমার সাথে অনেকক্ষণ গল্প করে, রান্নার কাজে সাহায্য করে দেয়। কোনদিন পায়েস বা মাংস রান্নাও করে দেয় মনিদিপা। মাঝে মাঝে রাতের খাবারের সময় দেবেশের মা ওর বাবাকে বলে, “জান আজ মাংস’টা মনি রান্না করেছে।” দেবেশের বাবা মাংস খেয়ে বেশ তৃপ্তির সুরে বলে, “মেয়েটা বেশ ভাল রান্না করতে জানে গো।”

কোনদিন বিকেলে কলেজ থেকে ফেরার পরে দেবেশ যখন ছাদের ঘরে পড়তে বসে, তখন মনিদিপা ওর জন্য মাঝে মাঝে চা নিয়ে যায় বা মাঝে মাঝে গিয়ে জিজ্ঞেস করে আসে কিছু চায় কিনা। মনিদিপার একটা ছুত চাই একটু দেবেশের পাশে থাকার। দেবেশের সে সব দিকে কোন খেয়াল নেই যে মনিদিপার মন অন্য কিছু চায়, শুধু মাত্র শরীরের খিধে নয় আরও কিছু জেগে উঠেছে মনিদিপার মনের গহিন কোনে।

দেবেশ জিজ্ঞেস করে মনিদিপা কে, “কি গো মনিদি, আজকের মাংসটা তুমি রান্না করলে?”

মনিদিপা উলটে জিজ্ঞেস করে দেবেশকে, “কেন তোর ভাল লাগেনি?” অবচেতন মনের মধ্যে এক শুরু হয় এক তোলপাড়।

গালে, ঠোঁটে চুমু খেয়ে উত্তর দিল দেবেশ, “তুমি করবে রান্না আর সেটা খারাপ হবে? হতেই পারেনা মনিদি। তোমার হাতে জাদু, চোখে জাদু শরীরের সারা অঙ্গে প্রতঙ্গে জাদু।”

মনিদিপা ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বলতে চেষ্টা করল, “নারে দেবেশ, আমি জাদু দেখাতে চাইনা তোকে শুধু চাই…” কি চাই মনিদিপার, কি করে পূরণ করবে সেই আকাঙ্ক্ষা।

এক রাতে মনিদিপা ওকে প্রস্ন করে, “কিরে তোর পড়াশুনা কেমন চলছে? তুই আজকাল ঠিক ঠাক পড়াশুনা করছিশ ত? সামনের বছর জয়েন্ট আই আই টি দিতে হবে, সেটা যেন ভুল না হয়।”

হাত জোড় করে মাথা নত করে উত্তর দিল দেবেশ, “ওকে মা দুর্গা দুর্গতিনাশিনী, আমি ঠিক ঠাক পড়াশুনা করছি, চিন্তা নেই।”

একদিন একদিন করে মাস শেষ হল, এগিয়ে এল মনিদিপার ট্রিট দেবার দিন। বাড়ির লোকেরা জানত যে মনিদিপা দেবশকে ট্রীট দেবে আর তা নিয়ে কোন আপত্তি ছিলনা। হবে বাই কেন, দুই বাড়ির মধ্যে খুব নিবিড় সম্পর্ক। বাবার সাথে মানব জেঠুর আর মায়ের সাথে জেঠিমার। কিন্তু বাড়ির কেউই জানত না যে রাতের অন্ধকারে ওই দুজনের মাঝে কি খেলা চলছে। হয়ত জানতে পারলে দেবেশকে ওর বাবা মেরে ফেলে দেবে বা মনিদিপা কে ওর বাবা।

কলেজ থেকে সোজা মনিদিপার অফিসে চলে যায় দেবেশ। বেশ কিছুক্ষণ নিচে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করার পরে দেখে মনিদিপা ওর দিকে হাঁটতে হাঁটতে আসছে। আজ মনিদি কে দেখতে আরও সুন্দরী লাগছে, এর আগে ওকে ওইরকম সুন্দরী দেখনি দেবেশ। একটা ধবধবে সাদা রঙের জিন্স যা ওর পাছা, থাই পায়ের গুলির সাথে এঁটে আছে আর ওপরে একটা গাড় নীল রঙের ঢিলে টপ। গলায় জড়িয়ে একটা ঘিয়ে রঙ্গের স্টোল। মাথার চুল খোলা পিঠ পর্যন্ত নেমে এসেছে। সাক্ষাৎ যেন উর্বশী ওর সামনে দাঁড়িয়ে ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে।

গোলাপি ঠোঁটে মধু ঢেলে জিজ্ঞেস করল মনিদিপা, “কিরে কেমন গেল তোর কলেজ?”

“আমার কলেজ ত ভাল গেল” পাশে গিয়ে কোমরে হাত রাখল দেবেশ, “তোমাকে আজ ভারী সুন্দরী দেখাচ্ছে, জানো কি মনে হচ্ছে…”

ওর বুকে আলত করে কিল মেরে জিজ্ঞেস করল, “কি মনে হচ্ছে তোর?”

দেবশ কোমরটা আরও নিবিড় করে জড়িয়ে ধরে কানেকানে বলল, “এই রাস্তার মধ্যে তোমার ওই সুন্দর ঠোঁট দুটি নিয়ে খেলা করি আর তোমাকে নিয়ে চুটিয়ে প্রেম করি।”

একটু ঠেলে দিল ওকে, “যাঃ বদমাশ ছেলে, এটা রাস্তা রে, ছাড় আমাকে।”

দেবেশ মনিদিপার হাত ধরে হাঁটতে শুরু করল, “আমি ত আজ খাব না, চল না একটা সিনেমা দেখি বা কোথাও গিয়ে বসি।”

মনিদিপা ওর বাঁ হাত নিজের দুই হাতে জড়িয়ে ওর সাথে সাথে হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞেস করল, “কোথায় যেতে চাস বল?”

দেবেশ উত্তর দিল, “চল না, আউট্রাম ঘাটে গিয়ে গঙ্গার পাড়ে বসি।”

“উম্ম… মনের কোণে প্রেমের ফুল ফুটেছে মনে হচ্ছে”, দুষ্টু মিষ্টি হাসি হাসি মুখে উত্তর দিল মনিদিপা, “চল তাহলে গঙ্গার পাড়ে গিয়ে বসি।”

একটা ট্যাক্সি নিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা দুজনে গঙ্গার পাড়ে পৌঁছে গেল। হাতে হাত রেখে গঙ্গার পাড় দিয়ে হাটতে শুরু করল ওরা। সারা টাক্সিতে দেবেশের কাঁধে মাথা রেখে চুপ করে ওর হাতের আঙ্গুল নিয়ে খেলা করছিল মনিদিপা। কখন ওর হাত নিজের ঠোঁটের কাছে এনে চুমু খেল কখন ওর হাত নিজের গালে ছোঁয়াল মনিদিপা। ওর মনের ঈশান কোনে আজ প্রেমের পূর্ণিমা, আজ যেন ওর দোল আজ যেন ওর মহা অষ্টমীর পুজ।

মনিদিপার মনের ভেতরে প্রেমের বন্যা বইছে, ওযে সত্যি সত্যি ভালবেসে ফেলেছে দেবেশ কে, কিন্তু এই সমাজ কি করে সেটা মেনে নেবে। মা, কাকিমা, বাবা, কাকা কেউই হয়ত মেনে নেবেনা। কেননা ও বড় আর দেবেশ ছোটো। কোনোদিন কি বউ বড় হয়, বউ সবসময়ে বরের চেয়ে ছোট হয় এই ত নাকি নিয়ম। কে জানি কে লিখে গেছে এই নিয়ম।

মনিদিপাকে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকতে দেখে দেবেশ জিজ্ঞেস করল, “কি ভাবছ মনি?”

এতদিন শুধু মনিদি বলে ডেকেছে দেবেশ, হটাত ওর মুখে মনি নাম শুনে মন কেমন করে উঠল মনিদিপার। এই সব কথা ভাবতে ভাবতে মনিদিপার চোখের কোণে একটু খানি জল চলে এসেছিল। মুখ না উঠিয়ে হালকা হেসে উত্তর দিল, “না রে কিছু না।” তারপরে অকাঠ একটা মিথ্যে কথা বলে দিল দেবেশ কে, “আজ এত দিন পরে নিজের আয় করা পয়সা পেলাম তাই মনটা খুশীতে ভরে উঠেছিল আর চোখে জল এসে গেছিল।” মেয়েদের মিথ্যে কথা ধরা বড় কঠিন ব্যাপার, দেবেশ বুঝতেও পারল না যে মনিদিপার চোখে জল কেন, আসল কারন টা কি।

কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী (#9)

পশ্চিম আকাশে সূর্য ডোবার আভাস। লাল হয়ে উঠেছে আকাশ আর তার সাথে লাল হয়ে উঠেছে গঙ্গার জল। ধিরে ধিরে চারদিকে আঁধার নেমে এসেছে। মাথার ওপরে পাখিরা এক এক করে বাসায় ফিরে চলেছে। গঙ্গার পাড়ে বসে দুজনে আইসক্রিম কিনে খেতে শুরু করল।

আইসক্রিম খেতে খেতে দেবেশ জিজ্ঞেস করল, “মনি নৌকায় চাপবে?”

মনিদিপা জিজ্ঞেস করল, “কেন রে, এখন আবার নৌকায় কেন? অন্ধকার হয়ে আসছে, বাড়ি ফিরতে হবে না।” মনিদিপা জানত না ঠিক ভাবে দেবেশের মতলব টা কি।

বাঁ হাতে মনিদিপার পাতলা কোমর জড়িয়ে ধরে কানের কাছে মুখ এনে বলল, “নৌকায় শুধু আমি আর তুমি, ব্যাস আর কেউ নয়। গঙ্গার ওপরে ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা হাওয়া খেতে খেতে বেশ একটা প্রেম প্রেম খেলা যাবে।”

কথাটা শুনে থমকে গেল মনিদিপা, “কি যে বলিস না তুই। না আমি যাব না।”

আরও নিবিড় করে টেনে নিল দেবেশ। মনিদিপার মনে একটা প্রেমের আভাস জেগে উঠল। দেবেশ আস্তে করে মনিদিপার বুকে হাত দিল। কেঁপে উঠল মনিদিপা।

ওর দিকে ভ্রূকুটি চোখে তাকাল, “এই যাঃ কি করছিস লোকজন আছে যে।”

দেবেশ ওর কথার দিকে কোন কান দিল না, টপের ওপর দিয়েই মনিদিপার সুগোল স্তন নিয়ে হাল্কা টেপাটিপি শুরু করে দিল। মনিদিপার গা গরম হয়ে উঠল দেবেশের হাতের ছোঁয়ায়, চোখ পাতা যেন হাতের চাপে ভারী হয়ে উঠেছে।

ফিসফিস করে বলে উঠল মনিদিপা “প্লিস ছেড়ে দে আমাকে, এযে দিনের আলো আর সবাই আছে, সবাই দেখতে পাবে যে… প্লিস দেবেশ করিস না… আমার লক্ষ্মী ছেলে … দেবু প্লিস… ” মনিদিপা একটু ঠেলে সরিয়ে দেয় দেবেশের হাত।

দেবেশ ওর কানে কানে বলল, “কেউ দেখবে না মনি, অন্ধকার হয়ে আসছে আর সব কাপল করে এই রকম। প্লিস হাত সরিয়ে দিয় না।”

নিজের অজান্তেই মনিদিপার শরীর ঢিলে হয়ে গেল, হাত চলে গেছে দেবশের কোলে। দেবশের সাহস যেন আরও বেড়ে গেল। মনিদিপার পেলব থাইয়ের মাঝে হাত ঢুকিয়ে দিল দেবেশ। চেপে ধরল জিন্সের ওপরে দিয়ে মনিদিপার যোনীদেশ। উত্তপ মনিদিপা যোনীর ওপরে দেবশের হাতের ছোঁয়া পেয়ে যেন আরও পাগল হয়ে উঠল। কিন্তু এখন অন্ধকার হয়নি, তার ওপরে চারদিকে লোকজন ত আছেই। দুহাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরল দেবেশের হাত, যাতে আর বেশি কিছু করতে না পারে। কিন্তু দেবেশের অনেক শক্তি, ধরা হাত নিয়েই জিন্সের ওপর দিয়ে মনিদিপার যোনীর ওপরে চাপ দিতে থাকল।

“উম্মম কি মস্ত মাগি রে… মাই নয়ত যেন ডাব ঝুলছে… এই রকম ডাঁসা মাল পেলে একবার নৌকায় চড়া যায়” হটাত করে ওদের কানে এইরকম একটা আওয়াজ এল। ধড়মড়িয়ে দুজন দুজন কে ছেড়ে দিল, পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখল কয়েটা ছেলে ওদের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দাঁত কেলাচ্ছে।

কান মাথা গরম হয়ে গেল মনিদিপার। বুকের মধ্যে যেন ঝড় শুরু হয়ে গেল মনিদিপার। সব রাগ গিয়ে পড়ল দেবশের ওপরে, “কেন ছেলেটা একটু সবুর করতে পারেনা, আমি কি শুধু মাত্র একটা ভোগের পুতুল?” রেগে মেগে ওখান থেকে উঠে হাটা দিল। মনিদিপার রাগ দেখে প্রথমে একটু থমকে গেছিল দেবশ। তারপর যখন দেখল যে সত্যি মনিদিপা ওকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে তখন ওর পেছনে দৌড়াতে শুরু করল।

দৌড়ে ওর কাছে গিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করল, “কি হল মনি?”

মনিদিপার চোখ ফেটে জল এসে গেছে। ওর সামনে দাঁড়িয়ে সজোরে এক থাপ্পড় লাগিয়ে দিল দেবেশের গালে। চিৎকার করে উঠল, “তুই শুধু আমাকে ভোগের জিনিস পেয়েছিস তাই না। সময় নেই, জায়গা নেই, শুধু আমার শরীরটাকে নিয়ে খেলতে পারলে যেন তোর শান্তি হয়। আমার পোড়া কপাল, কেন যে আমি মরতে তোকে রাতে আমার বাড়িতে ডেকেছিলাম। তুই ত আজ আমাকে বাজারে নামিয়ে আনলি দেবেশ।”

গাল লাল হয়ে গেছে মনিদিপার চড় খেয়ে। উত্তর দেবার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে দেবেশ, সত্যি ওর কামনার আগুন অনেক বেশি বেড়ে গেছে, মনিদিপা ওর কাছে এখন শুধু মাত্র একটা কামনার বাসনার শরীর। কি বলবে দেবেশ, ও যে মনিদিপাকে এখন ভালবাসেনি। শুধু ওর যৌবন রস পান করার জন্য ওর দিকে এগিয়ে গিয়েছে।

“তোর কাছে কোন উত্তর নেই ত? তুই একটা কুকুর। আর কোনদিন আমার সামনে আসবি না তুই।” কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল মনিদিপা তারপরে ওকে ছেড়ে রাস্তার দিকে দৌড়ে চলে গেল।

দেবেশ কিছুক্ষণ স্থানুর মতন দাঁড়িয়ে রইল, কি করবে কি বলবে ভেবে পেলনা। কিছুক্ষণ বাদে দৌড়ে গেল মনিদিপাকে ধরার জন্য। রাস্তায় গিয়ে দেখল যে, মনিদিপা ওর সামনে দিয়ে একটা টাক্সি চেপে চলে গেল। রাতের অন্ধকারে আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে রইল দেবেশ। কি করতে কি করে ফেলল ও, সাধের রমণীর সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে এই রকম ভাবে সবার সামনে খুলে দিল। কি করল, এই ভুলের শাস্তি মনে হয় নেই, এর মনে হয় ক্ষমাও নেই। রাগে দুঃখে কাঁপতে কাঁপতে বাড়ির পথ ধরল। নিজের চুল ছিঁড়তে বাকি, বাড়ি গিয়ে মনিদিপার পায়ে পড়ে যাবে, কাকুতি মিনতি করবে যে, “মনি ফিরে এস আমার কাছে।” মেয়েদের মন বোঝা বড় কঠিন, তাও একবার যাবে ও মনিদিপার কাছে।

অনেক রাত করে বাড়ি ফিরল দেবেশ, বাড়ি গিয়ে কি অবস্থা হবে সেই নিয়ে মনের মধ্যে একটা ঝড় বয়ে চলেছে। মনিদিপাদি যদি বাবা মাকে বলে দেয় তাহলে ওর বাড়িতে থাকা বন্ধ হয়ে যাবে, বাবা মা ওকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবে নিশ্চয়। বাড়ি ফিরে দেখল মা এক মনে টি ভি দেখছে, কারুর মুখে কোন বিকার নেই।

মা ওকে দেখে জিজ্ঞেস করল, “কিরে মনি তোকে কোথায় ট্রিট দিল?”

মায়ের গলার আওয়াজ শুনে ধড়ে প্রান ফিরে এল দেবেশের, না তাহলে এখন কিছু অঘটন ঘটে যায় নি। মাথা নিচু করে উত্তর দিল, “না মানে এই এখানে সেখানে ঘুরে কাটালাম।”

মা জিজ্ঞেস করল ওকে, “কই মনি ত এলনা তোর সাথে?”

“না ওর একটু মাথা ব্যাথা করছিল তাই বাড়ি চলে গেছে।” অকাট মিথ্যে কথা বলে নিজের ঘরে চলে গেল দেবেশ।

কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী (#10)

একা একা বিছানার ওপরে শুয়ে রইল, কিছুই আর ভাল লাগছে না ওর। কামনার আগুনে পুড়ে একি করে ফেলল দেবেশ। মনিদিপাকে অনেক হেনস্থা করেছে ও সবার সামনে, আজ ওর পায়ে পরে ক্ষমা চেয়ে নেবে আর কোন দিন ওর সামনে যাবে না।

রাতের আঁধারে চুপি চুপি মই লাগিয়ে মানব জেঠুর ছাদে উঠল দেবেশ। সিঁড়ির দরজা বন্ধ দেখে, পাইপ বেয়ে দুতলায় নামল। চোরের মতন বারান্দা দিয়ে পাটিপে টিপে, মনিদিপার ঘরের দিকে এগোল। ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। আস্তে করে কড়া নাড়ল দেবেশ। কোন আওয়াজ নেই, আবার কিছুক্ষণ পরে কড়া নাড়ল দেবেশ। এবারে যেন পায়ের আওয়াজ শুনতে পেল।

দরজা খুলে হাঁ করে তাকিয়ে রইল মনিদিপা, সামনে কাকুতি ভরা চোখে নিয়ে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে দেবেশ।

ওই মুখ দেখে আরও রেগে গেল মনিদিপা, চোখ ফেটে জল চলে এল, বুকের পাঁজর একটা একটা করে যেন কেউ ভেঙ্গে দিচ্ছে। চাপা স্বরে কেঁদে উঠল মনিদিপা, “তুই একটা স্বার্থপর, নিজের খিদে ছাড়া আর কিছু জানিস না তুই। তুই আমাকে নিয়ে অনেক খেলা করেছিস। আমি তোকে মন দিয়ে…” আর কথা শেষ করতে পারল না… হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলল মনিদিপা। দেবেশের মুখের সামনে দরজা বন্ধ করে দিল, ওকে উত্তর দেবার সময় দিলনা পর্যন্ত। চিৎকার করে উঠল মনিদিপা, বন্ধ দরজার পেছন থেকে, “চলে যা তুই আমার সামনে থেকে, আর কোনোদিন আমার সামনে আসবি না তুই… তুই আমার মান সন্মান সব নিলাম করে দিয়েছিস আজ। আমি আয়নার সামনে দাঁড়াতে পারছিনা, নিজেকে এত ছোটো মনে হচ্ছে।”

বন্ধ দরজার সামনে কিছুক্ষণ হাঁ করে জড় ভরতের মতন দাঁড়িয়ে রইল দেবেশ। ওর শরীরের সব রক্ত যেন কেউ শুষে নিয়েছে। হাঁটার শক্তি টুকু হারিয়ে ফেলেছে। বন্ধ দরজার সামনে হাত জোড় করে নিচু স্বরে বলল দেবেশ, “মনিদি আমাকে পারলে ক্ষমা করে দিও আমি তোমার জীবনের সব থেকে বড় পাপী। আমি আর তোমার সামনে কোন দিন আসব না মনিদি।”

মনিদিপা দরজার ওপার থেকে দেবেশের কান্নার সুর শুনে, মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল, “একি করেছে ও, শেষ পর্যন্ত একটা লম্পট ছেলে কে মন দিয়ে ফেলছে, তাও আবার নিজের থেকে ছোটো। একি ভুল করে ফেলেছে। একি ভালবাসা না যৌন ক্ষুধা।” ককিয়ে ককিয়ে কেঁদে উঠল মনিদিপা, “আমি তোকে ভালবাসি রে দেবেশ… আমার মতন পাপী আর এই পৃথিবীতে কেউ নেই। আমি যে তোকে প্রান দিয়ে ভালবাসি।”

এই নিশুতি রাতে, দূর থেকে ভেসে এল একটা গান—

জড়িয়ে ধরেছি যারে সে আমার নয়
কখন বুঝিনি আমি কে আমার নয়
কখন বুঝিনি আমি কে আমার নয়
মন তার নেমে এল চোখের পাতায়
ভালবাসা এসে বুকে দাগ দিয়ে যায়
ভুল দিয়ে মালা গেঁথে
ভুল দিয়ে মালা গেঁথে পরাল আমায়
তবু বোঝা গেল না’ত সে আমার নয়
কখন বুঝিনি আমি কে আমার নয়

বন্ধ দরজার পেছনের সেই আওয়াজ কোনদিন দেবেশের কানে পউছাল না। যেরকম ভাবে পাইপ বেয়ে এসেছিল, ঠিক সেই রকম ভাবে আবার নিজের ঘরে চলে গেল দেবেশ। সারা রাত ঘুমতে পারল না, বিছানায় পড়ে ছটফট করতে থাকল।

সারাদিন দেবেশের মনের মধ্যে শুধু মনিদিপাদির কথা ঘুরে বেরাল, মন আর কিছুতে টিকতে চাইছেনা। আগে মনিদিপাদির কাছে যাবার জন্য মন আকুলি বিকুলি করত এখন মনিদিপাকে ছেড়ে মন আকুলি বিকুলি করছে। বিকেল বেলা কলেজ থেকে ফিরে দেখে বাড়িতে মনিদিপার মা, মানে জেঠিমা বসে মায়ের সাথে গল্প করছে।

জেঠিমা ওকে দেখে জিজ্ঞেস করল, “কি রে কাল তোদের কি কোন ঝগড়া হয়েছিল?”

দেবেশের মনে হল যেন কেউ পেরেক দিয়ে ওর পা মেঝের সাথে গেঁথে দিয়েছে। মাথা নিচু করে উত্তর দিল, “কই না তো।”

জেঠিমা উত্তর দিল, “ও বাবা, কি জানি মেয়ের কি হল, কাল রাতে একদম মন মড়া ছিল। রাতে কিছু খায়নি আবার সকাল বেলাও না খেয়ে বেড়িয়ে গেছে। আজ বলছিল দেরি হবে। এই বারাসাত থেকে কলকাতা, রোজ রোজ যাওয়া, তাই নাকি ও আরও কয়েক জন মিলে ওর অফিসের কাছে একটা ফ্লাট ভাড়া করে থাকবে।”

মা জেঠিমা কে জিজ্ঞেস করল, “মনি বলল আর তুমি ওকে ছেড়ে দিলে? কি যে কর তুমি দিদি।”

জেঠিমা উত্তর দিল, “তুই ত আর জানিশ না ওকে, ওর যা জিদ।”

মা হেসে উত্তর দিল, “মনি আমার সোনার টুকরো মেয়ে, সাত রাজার এক মানিক। আমার যদি কোন বড় ছেলে থাকত তাহলে তোমার মনিকে আমি আমার বাড়ির বউমা করে নিতাম।”

মায়ের কথা শুনে দেবেশের বুক ফেটে চৌচির হয়ে গেল, চোখ জ্বালা করতে শুরু করে দিল। তাহলে ওর মনিদিপাদি আর ওর হাতের নাগালের কাছে থাকবে না। চিরদিনের মতন হারিয়ে যাবে, আর মায়ের মনে যে এত সাধ ছিল তা কি আর ও জানত। এখন আর কি হবে।

দিন দুই এই রকম ভাবে কেটে গেল দেবেশের, জীবনটা কেমন যেন ছন্নছাড়া হয়ে গেল ওর। একদিন খবর এল যে মানব জেঠুর বড় ছেলে প্রদিপ কোন পাঞ্জাবি মেয়েকে বিয়ে করে চণ্ডীগড়ে ঘর জামাই হয়ে চলে গেছে। দেবেশের মনে সেই ঘটনাটা তেমন কিছু দাগ কাটল না কেননা প্রদিপ কে ও কোনদিন দেখতে পারত না।

ব্যাথা লাগল সেদিন, যেদিন কলেজ থেকে ফিরে শুনল যে মানব জেঠু বাড়ি বিক্রি করে কলকাতায় মনিদিপাদির সাথে ভাড়া বাড়িতে থাকবে। সারারাত ধরে দেবেশ কেঁদে বালিশ ভাসিয়ে দিল, দেয়ালে মাথা ঠুকেও কোন কিছুর উপায় করতে পারল না। আর তিন মাস পরে ওর জয়েন্ট আই আই টি পরীক্ষা, কিন্তু সব ছেড়েছুরে ওর মন বৈরাগী হয়ে গেছে। মন বলছে শেষ পর্যন্ত ও বাবার দোকানে গিয়ে বসবে। মনিদিপাদি কে কথা দিয়েছিল যে ও আই আই টি পড়বে, কিন্তু যখন ওর জীবন থেকে প্রান প্রেয়সী মনিদিপা চলেই গেছে তাহলে আর কার জন্য ও জয়েন্ট আই আই টি দেবে।

এই ভাবে আরও দেড় মাস কেটে গেল। একদিন কলেজ থেকে ফিরে বাবার মুখে শোনে যে মানব জেঠুর নাকি খুব শরীর খারাপ। মাকে জিজ্ঞেস করাতে জানতে পারল যে মানব জেঠুর হার্ট এটাক হয়েছে। তার ওপরে নাকি বুকে পেস মেকার বসাতে হবে। বাবা দৌড় দিয়েছে কলকাতায়। দেবেশের যাবার ইচ্ছে থাকলেও উপায় ছিল না, কি মুখ নিয়ে দাঁড়াবে ও মনিদিপার সামনে।

কিছুদিন পরে খবর এল যে, পেস মেকার বসানর পরেও মানব জেঠু দেহ রক্ষা করেছেন। সেই কথা শুনে দেবেশের পায়ের তলায় ভুমিকম্প হয়েছিল। না মানব জেঠুর জন্য নয়, মনিদিপাদির কথা ভেবে, দেবেশ আর থাকতে পারেনি। বাবাকে নিয়ে দৌরে গেল গরিয়াহাটায় মনিদিপার বাড়িতে।

চৌকাঠে পা রেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল দেবেশ। চোখের সামনে, সাধের মূর্তি মনিদিপাদি যেন কালি মেখে বসে আছে। সেই ফর্সা গোলগাল চেহারার মনিদিপাদি আর নেই, এক কাঠের পুতুল ভাসা ভাসা চোখে নিয়ে বাবার মৃতদেহের পাশে বসে। আস্তে করে হাঁটু গেড়ে মনিদিপাদির পেছনে গিয়ে বসল দেবেশ। আলত করে কাঁধে হাত ছোঁয়াল। পুরনো হাতের পরশ পেয়ে মনিদিপার হৃদয় কেঁদে উঠল।

কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী (#11)

অনেকক্ষণ পরে পেছনে তাকিয়ে দেবেশ কে দেখে, হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলল মনিদিপা, “আমার সব শেষ হয়ে গেল রে দেবু।”

ওর চোখের জল দেখে বুক ফেটে চৌচির হয়ে গেল। দুহাতে মনিদিপাকে জড়িয়ে ধরল দেবশ। কিন্তু কি সান্ত্বনা দেবে, যে যাবার তিনি ত চলে গেছেন ওদের ছেড়ে, চিরকালের জন্য। তাকে ত আর দেবেশ ফিরিয়ে আনতে পারবে না। মনিদিপাকেই বাবার মুখে আগুন দিতে হয়েছিল, ওর মা ওর দাদাকে আসতে বারন করে দিয়েছিল। যে ছেলে বাবার অসময়ে দেখতে আসতে পারেনি সে ছেলে বাবার মুখে কি আগুন দেবে। বাবার মুখে আগুন দেবার পরে মনিদিপা অজ্ঞান হয়ে গেছিল। দেবেশ ওকে কোলে তুলে মুখে চোখে জল ছিটিয়ে আবার সুস্থ করে তুলেছিল।

তিনদিনের কাজের পরে দেবেশ বাড়ি ফিরে আসে। বাড়ি ফিরে আসার আগে দেবেশ মনিদিপাকে বলেছিল, “আমাকে ডাক দিও মনি, আমি তোমার জন্য পথ চেয়ে দাঁড়িয়ে থাকব।”

তার উত্তরে মনিদিপা মাথা নেড়ে বলল, “না, আমার জীবনে কারুর দরকার নেই। আমি আমার জীবন নিজে থেকে তৈরি করে নিতে পারব। তুই ভাল থাকিস আর ভাল করে পড়াশুনা করে বড় হস। আমার কথা আর চিন্তা করিশ না তুই। তোর সামনে এক বিশাল পৃথিবী পরে আছে, দু হাতে তাকে জড়িয়ে ধরিস আর আমাকে মন থেকে ভুলে যাস।” তারপরে কানে কানে বলেছিল, “আমরা খেলার ছলে অনেক দূর এগিয়ে গেছিলাম, সেগুলো সব একটা ভয়ানক স্বপ্ন ভেবে আমাকে মাফ করে দিস, যদি পারিস।”

হাত ধরে কেঁদে উঠেছিল দেবেশ, “তুমি আমাকে পর করে দিচ্ছ মনি। আমি কি নিয়ে থাকব জীবনে। আমি তোমাকে সত্যি ভালবাসি, যে।”

মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিল, “তুই আমাকে না আমার শরীরকে ভালবেসে ছিলিস। আজ’ত তুই আমাকে দেখবি’ও না আর কেউ দেখবে না। তুই চলে যা রে, বেশিক্ষণ আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকলে আমি আত্মহত্যা করব।”

চোখের জল ফেলতে ফেলতে ফিরে এল দেবেশ। প্রানের মনিদিপাদি কে ফিরিয়ে আনতে পারল না আর।

নতুন করে জীবন শুরু করার চেষ্টা করল, ভাবল সুকন্যার প্রেমে পরে ও মনিদিপাদি কে ভুলে যাবে। কিন্তু বাধ সাধল সেই পুরনো স্মৃতি। যাই করতে যায় না কেন, সবসময়ে চোখের সামনে ভেসে বেড়ায় মনিদিপাদির কান্না ভেজা দু চোখ। সুকন্যার সাথে আর ওর ভালবাসা হল না, হলনা কিছুই করা। পড়াশুনা এক রকম গতানুগতিক ভাবে এগিয়ে চলছে। রোজ সকালে উঠে কলেজ যাওয়া, বিকেল বেলা কলেজ থেকে বাড়ি ফেরা। রাতের বেলা পাশের বাড়ি দেখা। মানব জেঠু বাড়ি বিক্রি করে দেবার পরে সেইখানে এক প্রমটার এক পাঁচ তলা ফ্লাট বাড়ি বানাচ্ছে। বাড়ির সাথে সাথে মনিদিপাদির স্মৃতি জড়িয়ে ছিল, সেটাও ভেঙ্গে মাটির সাথে মিশে গেল একদিন।

কিছুদিন পরে বেশ রাত করে বন্ধুদের সাথে আড্ডা মেরে বাড়ি ফিরে দেখে বসার ঘরে মা জেঠিমা আরও অনেকে বসে, সবার চোখে জল। দুজনে যেন অনেকক্ষণ ধরে হাউ হাউ করে কেঁদেছে। জেঠিমা দেবেশকে ঢুকতে দেখে আরও জোরে কেঁদে উঠল।

কাঁপা গলায় বলল, “বাবারে… আমার মনি আর নেই…”

কথাটা ঠিক কানে যায় নি দেবেশের। মাথা ঘুরে পরে গেল দেবেশ, কি হয়েছে, জেঠিমা কি বলছে, মনিদিপাদি নেই মানে? কি হয়েছে মনিদিপাদির। বাড়ির চাকর ওর চোখে মুখে জলের ছিটে দিয়ে জ্ঞান ফেরাল।

মায়ের পাশে বসে মাকে জিজ্ঞেস করল, “ও মা, কি হয়েছে মনিদিপাদির?”

মায়ের দুটি লাল চোখে জল, টলমল করছে, “হ্যাঁ রে বাবা, আমার সাধের মনিদিপা আর এই পৃথিবীতে নেই। আমাদের ছেড়ে চলে গেছে মেয়েটা। আমার মেয়েটা কত ভাল ছিল রে……”

বাবার দিকে তাকাল দেবেশ, “কি হয়েছে মনিদিপাদির?”

ওর বাবা উত্তর দিল, “মনিদিপা আত্মহত্যা করেছে।”

দেবেশের মনে হল যেন ওর কানের ওপরে কেউ সজোরে এক থাপ্পড় মেরেছে। মাথা ভোঁভোঁ করে উঠল, “কেন কি হয়েছে? কে করল আত্মহত্যা, তোমরা কি করে জানলে?”

ওর বাবা উত্তর দিল, “মনিদিপা অনেক ভাল মেয়েরে। ওর মতন ত মেয়েই হয় না মনে হয়। মানবদার শরীর খারাপের জন্য ওর অনেক টাকার দরকার ছিল, আমাকে একবারের জন্যও বলল না ও। এই একটা চিঠি পাওয়া গেছে ওর ব্যাগ থেকে।”

“মানে?” জিজ্ঞেস করল দেবেশ।

উত্তরে ওর বাবা ওকে জানাল, “আজ খুব সকালে মনিদিপা বলে বেড়িয়ে ছিল যে অফিসের কাজে বম্বে যাচ্ছে। তারপরে ন’টা নাগাদ কেউ গঙ্গার ঘাটে একটা ব্যাগ কেউ কুড়িয়ে পায়, আর তার সাথে মনিদিপার পরনের জামাকাপড়ের কিছু অংশ। লাশ পাওয়া যায়নি, হয়ত গঙ্গার জলে ভেসে গিয়েছে কোথাও। ওর ব্যাগ আর জামা কাপড় দেখে পুলিস ওর অফিসে খবর দেয়। তারপরে অফিসের লোকেরা তোর জেঠিমাকে খবর দেয়। ব্যাগের ভেতরে একটা সুইসাইড নোট পাওয়া গেছে।”

দেবেশ জিজ্ঞেস করল বাবাকে, “কি লেখা ছিল তাতে।”

ও মা, মা গো,

বাবার শরীর খারাপের সময়ে অনেক টাকার দরকার হয়েছিল, তার জন্য আমি অনেকের কাছে হাত পেতে টাকা ধার করেছি। সেই টাকা শোধ করার মতন আমার আর শক্তি নেই। বাবাই যখন রইলেন না ত সেই টাকা শোধ করে কি করব। এদিকে পাওনাদারদের তাগাদা, আর আমি একা একটা মেয়ে। এই বিশাল পৃথিবীতে কাউকে ভরসা করে কিছু বলতে পারলাম না, কাউকে ঠিক ভাবে ভালবাসতে পারলাম না। ও মা, তুমি কেঁদো না যেন, মা গো। তোমার পাগলি মেয়ে তোমাকে আর মুখ দেখাতে পারবে না বলে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাচ্ছে, মা। মা গো তুমি কেঁদো না, নরেশ কাকুর কাছে চলে যেও মা, নরেশ কাকু তোমাকে ফেলবে না।

আর আমার বিয়ের জন্য যে হার টা বানিয়ে ছিলে সেটা দেবেশ কে দিও, বোলো ও যখন বিয়ে করবে তখন যেন ওর বউকে দেয়। আর ওকে বোলো যে ও যেন পড়া শুনা করে, আই আই টি যেন পায়। আমার ভালবাসা ওর সাথে সবসময়ে থাকবে।

কাকিমা কে বোলো, পরের জন্মে আমি ঠিক কাকিমার বাড়ির বউ হয়ে আসব। মা গো, আমাকে ক্ষমা করে দিও, আমি বড় পাপী অভাগী মেয়ে, মা। পরের বারে ভাল মেয়ে হয়ে তোমার কোলে ঠিক ফিরে আসব। মা গঙ্গা যেন আমাকে নিজের করে নেয়, মা।

ইতি তোমার অভাগী কলঙ্কিনী মেয়ে, মনিদিপা।

কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী (#12)

চিঠির কথা শোনার পরে দেবেশের দিগবিদিগ জ্ঞান হারিয়ে গেল। কি করবে আর, যার প্রেমে শেষ পর্যন্ত পড়ল সেই ওকে ছেড়ে দিয়ে চলে গেল। সারা রাত কাঁদার পরে সকাল বেলা চোখ মুছে মনিদিপাদির গলার হার হাতে নিয়ে প্রতিজ্ঞা করেল যে আই আই টি ও পাবেই। কারুর সাধ্যি নেই ওর আই আই টি রুখে দেবে। ওর সাথে আছে জেঠিমার দেওয়া মনিদিপার সোনার হার।

এক মাস বাকি আর পরীক্ষা দেবার। পুরপুরি বদলে গেল দেবেশ ঘোষাল। লোহার মূর্তি হয়ে গেছে দেবেশ। কোন ঝড় ঝঞ্জা ওকে ওর পথ থেকে নাড়াতে পারছে না। এই রকম মনব্রিতি নিয়ে জোড় কদমে শুরু করে দিল পড়াশুনা। রোজ রাতে একবার করে ওই সোনার হার টা দেখে আর পড়তে বসে দেবেশ। পরীক্ষা দিল দেবেশ এবং দিল্লি আই আই টি তে, ইলেক্ট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং পেয়ে গেল।

কিছু দিনের মধ্যে ওকে বারাসাতের গলি ছেড়ে, তিলোত্তমা কোলকাতা ছেড়ে পাড়ি দিতে হল দিল্লি। সব সময়ের সাথী মনিদিপার গলার হার। মনিদিপা আর নেই, তবে যদি কাউকে পায় কোনদিন তাকে পড়িয়ে দেবে দেবেশ। এই ভেবে সবসময়ে নিজের কাছে রেখে দিল ওই হার। ওই সোনার হার হয়ে গেল ওর রুদ্রাক্ষ মালা, ওর জীবনের সঙ্গী।

দিল্লী তে পড়ার সময়ে অনেক মেয়ের সানিধ্যে এসেছে দেবেশ, কিন্তু কাউকে ঠিক মনে ধরাতে পারেনি। সবার মধ্যে যেন মনিদিপাকে খুঁজে বেড়ায় ও।

বছর ঘুরে গেল, দেখতে দেখতে তিনটে বছর কেটে গেলে। পুরান স্মৃতির ওপরে অনেক ধুল জমে গেল। মনিদিপা এখন শুধু মাত্র একটি সোনার হার ছাড়া আর কিছু না। ও এখন আর মনিদিপাকে খোঁজে’না, খোঁজে এক ভালবাসার পাত্রী কে।

কলকাতার বাড়িতে এখন বাবা মা আর জেঠিমা থাকেন। গরমের ছুটির পরে কলকাতা থেকে ফিরছে দেবেশ। স্টেসান থেকে অটো নিয়ে হস্টেলের দিকে যাচ্ছে। ঠিক আই আই টি গেটের সামনে অটো একটা মেয়েকে ধাক্কা মেরে দিল। বিশেষ কিছু যদিও হয়নি মেয়েটার, তবুও ভদ্রতার খাতিরে নেমে গিয়ে সাহায্য করতে চাইল মেয়েটাকে। মেয়েটার মুখ দেখে দেবেশ থ। রিতিকা উপাধ্যায়, ওদের অঙ্কের প্রফেসার শ্যামল উপাধ্যায়ের মেয়ে, এল এস আর এ পরে। সারা আই আই টি মেয়েটার সৌন্দর্যের পেছনে পরে আছে।

দেবেশ জিজ্ঞেস করল রিতিকাকে “বেশি লাগেনি ত?”

মুখ তুলে তাকাল রিতিকা, “কি যে বল না, অটো ওয়ালা গুলো একদম দেখে চালায় না।”

দেবেশ বলল, “রিতিকা, তোমার কিন্তু দোষ ছিল। তুমি রাস্তা না দেখে পার হচ্ছিলে আর অটো ধাক্কা মেরেছে। যাইহোক বেশি লাগেনি মনে হয়, চল তোমাকে আমি বাড়িতে ছেড়ে দিচ্ছি।”

রিতিকা একজন অচেনা ছেলের মুখে নিজের নাম শুনে ঘাবড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “তুমি আমাকে চেন?”

হেসে উত্তর দিল দেবেশ, “হ্যাঁ তোমাকে কে না চেনে। তুমি উপাধ্যায় স্যারের ছোটো কন্যে আর এল এস আর এ সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্রী। আই আই টির সবাই তোমাকে চেনে আর আমি ত ইলেক্ট্রিকালের ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র তাই আমিও তোমাকে চিনি।”

ওর যা দেমাক তার সামনে কোন ছেলে আজ পর্যন্ত এত সাহস করে কিছু বলতে পারেনি। দেবেশের এত সাহস দেখে রিতিকা হেসে ফেলল, “ওকে চল তাহলে আমাকে বাড়ি পউছে দাও। আজ আমার ক্লাস মিস হল আরকি।”

অটো তে বসে দেবেশ রিতিকাকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি ত ইংলিশ নিয়ে পড়ছ তাই না?”

“বাঃবা, আমার সম্বন্ধে অনেক কিছু জানো দেখছি।” রিতিকা ওর দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে প্রশ্ন করল।

হেসে উত্তর দিল দেবেশ, “তুমি সুন্দরী আর ফেমাস তাই তোমার ব্যাপারে ত সবাই রিসার্চ করে। সেইখান থেকে আমিও কিছু শুনে ফেলেছি।”

হেসে জিজ্ঞেস করে রিতিকা, “তুমি আমার ওপরে রিসার্চ করনি?”

মাথা নাড়ায় দেবেশ, “না আমি করিনি, করার দরকার পড়েনি তাই করিনি।”

প্রশ্ন করল রিতিকা, “সবাই করে রিসার্চ তুমি কেন করনি?”

একদম অকাঠ সত্যি কথা বলে ফেলল দেবেশ, “তুমি ত ধরা ছোঁয়ার বাইরে তাই করিনি।”

এইরকম ভাবে কেউ যে কথা বলতে পারে সেটা রিতিকার ধারনা ছিলনা। হাঁ করে তাকিয়ে রইল দেবেশের মুখের দিকে।

“মুখ টা বন্ধ কর নাহলে মাছি ঢুকে যাবে” আলত করে চিবুকে আঙ্গুল ছুঁইয়ে মুখ বন্ধ করে দিল।

রিতিকা ত আর থ বনে গেল, কি সাহস ছেলের বাঃবা, প্রথম দেখায় চিবুকে হাত।

প্রফেসার কোয়ার্টার এসে গেল। রিতিকা অটো দাঁড় করিয়ে নেমে গেল, সাথে দেবেশ ও নামল।

মিষ্টি হেসে দেবেশের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল রিতিকা, “থ্যাঙ্ক ইউ ফর হেল্প। আমি মনে রাখব।”

একটু থেমে তারপরে হ্যান্ড সেক করল দেবেশ, “ওকে বাই।”

পেছন ফিরে চলে যাচ্ছিল দেবেশ, এমন সময়ে পেছন থেকে রিতিকার ডাক, “হ্যালো তোমার নামটা ত জানা হল না। বাবাকে জিজ্ঞেস করতে হবে যে তুমি সত্যি আই আই টি তে পড়।”

হেসে উত্তর দিল দেবেশ, “সন্দেহ থাকলে কাল ইলেক্ট্রিকালের প্রাক্টিকাল ক্লাসে চলে এস যখন খুশি আমাকে পেয়ে যাবে। পেয়ে গেলে তবে আমি আমার নাম বলব তার আগে নয়।”

রিতিকার সামনে কোন ছেলে নিজের নাম না জানিয়ে ওই রকম ভাবে চলে যাবে সেটা রিতিকার ঠিক হজম হল না, “ছেলেটা ত বড় বেয়াদপ। আমাকে অমান্য করা, আমার মতন সুন্দরীকে অমান্য করা। ঠিক আছে দেখে নেব আমি।”

দেবেশ হাসতে হাসতে হোস্টেলের দিকে হাটা লাগাল আর মনে মনে রিতিকার সুন্দর ফর্সা গোল মুখখানির ছবি এঁকে নিল। উফ কি একটা মেয়ে, যেমন দেখতে তেমন যেন দেমাক। হবে নাই বা কেন, বাবা আই আই টির প্রোফেসর, মা যে এন ইউ তে পড়ায়, দিদি সুইজারল্যান্ডএ থাকে, এই রকম মেয়ে কি আর বারাসাতের দেবেশকে ঘাস দেবে।